কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রেট: 10.00%
menu

bKash Digital Loan

বিকাশ ডিজিটাল ঋণের পরিচিতি ও প্রেক্ষাপট

বাংলাদেশে মোবাইল আর্থিক সেবার (MFS) জগতে বিকাশ একটি অগ্রণী নাম। ব্র্যাক ব্যাংক পিএলসি-এর একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ২০১১ সালের ২১ জুলাই প্রতিষ্ঠিত বিকাশ লিমিটেড, বাংলাদেশ ব্যাংকের এমএফএস লাইসেন্সের অধীনে কাজ করছে। শুরু থেকেই এর লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশের বিশাল জনগোষ্ঠী, যারা ব্যাংকিং সেবার বাইরে রয়েছে, তাদের কাছে সহজে আর্থিক সেবা পৌঁছে দেওয়া। এই লক্ষ্যে তারা ক্যাশ-ইন, ক্যাশ-আউট, ব্যক্তি থেকে ব্যক্তি লেনদেন (P2P), মার্চেন্ট পেমেন্ট এবং সম্প্রতি ডিজিটাল ঋণ পণ্য চালু করেছে।

বিকাশের মালিকানায় রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক লিমিটেড (বাংলাদেশ) এবং মানি ইন মোশন এলএলসি (ইউএসএ)। পরবর্তীতে ইন্টারন্যাশনাল ফিনান্স কর্পোরেশন (২০১৩), বিল ও মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন (২০১৪), অ্যান্ট ফিনান্সিয়াল (২০১৮), এবং সফটব্যাঙ্ক ভিশন ফান্ড ২ (২০২১) এর মতো আন্তর্জাতিক অংশীদাররা বিকাশে বিনিয়োগ করেছে। বিশেষ করে, সফটব্যাঙ্ক ভিশন ফান্ডের ২৫০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ বিকাশের কার্যকারিতা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

বিকাশ ডিজিটাল ঋণ হলো এই প্ল্যাটফর্মের একটি নতুন সংযোজন, যা দেশের অনানুষ্ঠানিক খাতের ব্যক্তি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য জামানতবিহীন, তাৎক্ষণিক ঋণ সুবিধা নিয়ে এসেছে। সিটি ব্যাংকের সাথে অংশীদারিত্বে এই সেবাটি পরিচালিত হয়, যেখানে বিকাশের বিশাল গ্রাহকভিত্তি এবং লেনদেনের তথ্য ব্যবহার করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-ভিত্তিক ঝুঁকি মূল্যায়নের মাধ্যমে ঋণ প্রদান করা হয়। এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য হল দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির পরিধি আরও বাড়ানো এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করা।

ঋণ পণ্য, শর্তাবলী ও আবেদন প্রক্রিয়া

ডিজিটাল ন্যানো ঋণ: পণ্য ও পরিমাণ

বিকাশ ডিজিটাল ঋণের প্রধান পণ্য হলো ডিজিটাল ন্যানো ঋণ, যা মূলত 'পে-লেটার' মডেলের জামানতবিহীন তাৎক্ষণিক মাইক্রোলোন। এই ঋণ বিকাশ অ্যাপের মাধ্যমে সরাসরি গ্রাহকদের কাছে পৌঁছানো হয়। ঋণের পরিমাণ সর্বনিম্ন ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৫০,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। এই ছোট আকারের ঋণগুলো দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে বা ক্ষুদ্র ব্যবসার মূলধন হিসেবে খুবই কার্যকর।

সুদের হার, ফি এবং পরিশোধের শর্তাবলী

বিকাশ ডিজিটাল ঋণের বার্ষিক সুদের হার (APR) গ্রাহকের ঝুঁকি প্রোফাইল অনুযায়ী পরিবর্তিত হয়, তবে এটি সাধারণত ১২% থেকে ২৪% এর মধ্যে থাকে (বাজারের সাধারণ হার অনুযায়ী)। ঋণের মেয়াদ সর্বোচ্চ ৬ মাস পর্যন্ত হতে পারে এবং কিস্তিগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রাহকের বিকাশ ব্যালেন্স থেকে নির্ধারিত তারিখে কেটে নেওয়া হয়। এর অন্যতম সুবিধা হলো, কোনো অতিরিক্ত চার্জ ছাড়াই মেয়াদ পূরণের আগেও ঋণ পরিশোধ করা যায়।

এই ঋণের জন্য কোনো উৎসের বা প্রক্রিয়াকরণ ফি নেই, যা এটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। যদি কোনো কিস্তি পরিশোধে বিলম্ব হয়, তবে প্রতি কিস্তির জন্য প্রতিদিন ১০০ টাকা বিলম্ব ফি প্রযোজ্য হতে পারে (এটি অ-যাচাইকৃত তথ্য, তবে বাজারের প্রচলিত প্রথা)।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এই ঋণগুলো সম্পূর্ণ জামানতবিহীন। ঋণ পাওয়ার যোগ্যতা মূলত গ্রাহকের বিকাশ লেনদেনের ইতিহাস এবং স্বয়ংক্রিয় ক্রেডিট স্কোরিং পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়, যা সিটি ব্যাংকের ক্রেডিট অ্যাসেসমেন্ট ফ্রেমওয়ার্কের সাথে সমন্বিত।

আবেদন প্রক্রিয়া ও প্রয়োজনীয়তা

বিকাশ ডিজিটাল ঋণের আবেদন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ডিজিটাল এবং সহজবোধ্য। এর জন্য কোনো শারীরিক কাগজপত্র জমা দিতে হয় না বা ব্যাংক শাখায় যেতে হয় না। গ্রাহকদের শুধু বিকাশ অ্যাপ ব্যবহার করতে হয়।

  • আবেদন মাধ্যম: আইওএস এবং অ্যান্ড্রয়েড উভয় অপারেটিং সিস্টেমের জন্য উপলব্ধ বিকাশ মোবাইল অ্যাপ।
  • কেওয়াইসি এবং অনবোর্ডিং: বিকাশ অ্যাকাউন্টের জন্য এজেন্ট-সহায়তায় ছবিযুক্ত আইডি দিয়ে নিবন্ধন করতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংক এমএফএস রেগুলেশনস, ২০২২ অনুযায়ী, গ্রাহকের কেওয়াইসি স্তরের ওপর ভিত্তি করে লেনদেনের সীমা নির্ধারিত হয়। ডিজিটাল ডকুমেন্ট আপলোডের মাধ্যমে উন্নততর কেওয়াইসি যাচাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।
  • ক্রেডিট স্কোরিং: বিকাশের নিজস্ব এআই-ভিত্তিক ঝুঁকি ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়, যা গ্রাহকের বিকাশ লেনদেনের ইতিহাস, পরিশোধের আচরণ এবং সিটি ব্যাংকের ক্রেডিট মূল্যায়ন কাঠামোকে কাজে লাগায়।
  • বিতরণ ও সংগ্রহ: অনুমোদিত ঋণের অর্থ তাৎক্ষণিকভাবে গ্রাহকের বিকাশ ওয়ালেটে জমা হয়। কিস্তি পরিশোধ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডেবিট হয়, তবে ম্যানুয়ালিও পরিশোধ করা যায়। সময়মতো পরিশোধের জন্য স্বয়ংক্রিয় অনুস্মারক এবং উৎসাহমূলক বার্তা পাঠানো হয়।

অ্যাপের বৈশিষ্ট্য, বাজার অবস্থান ও নিয়ন্ত্রণ

মোবাইল অ্যাপের বৈশিষ্ট্য ও ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা

বিকাশ মোবাইল অ্যাপটি ডিজিটাল ঋণ পরিষেবার কেন্দ্রবিন্দু। আইওএস (অ্যাপ স্টোর রেটিং ৪.২/৫) এবং অ্যান্ড্রয়েড (গুগল প্লে রেটিং ৪.০/৫) উভয় প্ল্যাটফর্মে এটি উপলব্ধ। অ্যাপটিতে একটি সুসংগঠিত লোন ড্যাশবোর্ড রয়েছে, যেখানে গ্রাহকরা তাদের ঋণের অবস্থা, পরিশোধের সময়সূচি এবং ক্রেডিট স্কোর সম্পর্কিত তথ্য দেখতে পান। গ্রাহকরা অ্যাপের সহজ ব্যবহার এবং তাৎক্ষণিক ঋণ বিতরণের জন্য প্রশংসা করেন, যদিও মাঝে মাঝে অ্যাপের গতি এবং গ্রাহক পরিষেবা অপেক্ষার সময় নিয়ে কিছু অভিযোগ দেখা যায়। বিকাশ ২৪/৭ কল সেন্টার এবং ইন-অ্যাপ চ্যাটের মাধ্যমে গ্রাহক সহায়তা প্রদান করে, যার গড় সমাধান সময় ২৪ ঘন্টারও কম।

নিয়ন্ত্রণমূলক অবস্থা ও লাইসেন্সিং

বিকাশ একটি বাংলাদেশ ব্যাংক অনুমোদিত এমএফএস প্রদানকারী। ডিজিটাল ঋণ পরিষেবাটি জামানতবিহীন ক্রেডিট নির্দেশিকা মেনে চলে। এটি মোবাইল ফাইনান্সিয়াল সার্ভিসেস রেগুলেশনস ২০২২, ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার রেগুলেশনস ২০১৪ এবং এএমএল/সিএফটি (এন্টি মানি লন্ডারিং/কমব্যাটিং ফিনান্সিং অব টেরোরিজম) নিয়মাবলী সহ সকল নিয়ন্ত্রক নিয়মাবলী অনুসরণ করে। ডিজিটাল ঋণ ব্যবসার জন্য বিকাশের বিরুদ্ধে কোনো নিয়ন্ত্রক জরিমানা রিপোর্ট করা হয়নি। বিকাশ যদিও ডিজিটাল ব্যাংকিং লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেছে এবং উচ্চ মূল্যায়ন স্কোর পেয়েছে, তবে এর অনুমোদন এখনও অপেক্ষাধীন। গ্রাহক সুরক্ষার জন্য বিকাশ স্বচ্ছ শর্তাবলী, পরিশোধের জন্য স্বয়ংক্রিয় সতর্কতা এবং বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য ইন-অ্যাপ চ্যাট ও কল সেন্টার সুবিধা প্রদান করে।

প্রতিযোগীদের সাথে তুলনা ও বাজার অবস্থান

বিকাশ বাংলাদেশের এমএফএস বাজারে প্রায় ৬০% লেনদেন শেয়ার নিয়ে শীর্ষস্থানীয় অবস্থানে রয়েছে। ডিজিটাল ঋণ পরিষেবাতেও এটি অন্যতম বৃহত্তম অ্যাপ-ভিত্তিক মাইক্রোলোন প্রদানকারী। এর প্রধান প্রতিযোগীরা হলো নগদ (বাংলাদেশ পোস্ট), রকেট (ডাচ-বাংলা ব্যাংক) এবং মাইক্যাশ (মারকান্টাইল ব্যাংক)। বিকাশ তার বৃহৎ গ্রাহকভিত্তি, প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্ব (যেমন অ্যান্ট ফিনান্সিয়াল, হুয়াওয়ে) এবং সিটি ব্যাংকের সাথে কৌশলগত অংশীদারিত্বের মাধ্যমে নিজেকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। বিকাশ উচ্চ সীমার জামানতবিহীন ঋণ এবং মার্চেন্ট-সংযুক্ত এসএমই অর্থায়ন নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা করছে, যা এর প্রবৃদ্ধিকে আরও বাড়িয়ে তুলবে। এ পর্যন্ত ১ মিলিয়নেরও বেশি গ্রাহক ৫.৫ মিলিয়নেরও বেশি বার ডিজিটাল ঋণ গ্রহণ করেছেন, যার মোট পরিমাণ ২৮ বিলিয়ন টাকা ছাড়িয়ে গেছে।

সম্ভাব্য ঋণগ্রহীতাদের জন্য ব্যবহারিক পরামর্শ

বিকাশ ডিজিটাল ঋণ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে, বিশেষ করে যারা প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে রয়েছেন তাদের জন্য। তবে, যেকোনো ঋণ নেওয়ার আগে কিছু বিষয় বিবেচনা করা অত্যন্ত জরুরি:

  • প্রয়োজনের মূল্যায়ন: ঋণ নেওয়ার আগে আপনার প্রকৃত প্রয়োজন এবং ঋণের উদ্দেশ্য স্পষ্ট করুন। অপ্রয়োজনীয় ঋণ এড়িয়ে চলুন।
  • পরিশোধের সক্ষমতা: ঋণের কিস্তি নিয়মিত পরিশোধ করার জন্য আপনার আয়ের উৎস এবং সক্ষমতা ভালোভাবে যাচাই করুন। নিশ্চিত করুন যে আপনি মাসিক কিস্তিগুলো সময়মতো পরিশোধ করতে পারবেন।
  • সুদের হার ও শর্তাবলী বোঝা: ঋণের সুদের হার, বিলম্ব ফি এবং অন্যান্য শর্তাবলী খুব ভালোভাবে বুঝে নিন। কোনো অস্পষ্টতা থাকলে বিকাশ গ্রাহক সেবায় যোগাযোগ করুন।
  • একাধিক ঋণের ঝুঁকি: একই সময়ে একাধিক প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নেওয়া থেকে বিরত থাকুন, কারণ এটি পরিশোধের চাপ বাড়াতে পারে এবং আপনাকে ঋণের জালে ফেলতে পারে।
  • ক্রেডিট স্কোর বজায় রাখা: সময়মতো কিস্তি পরিশোধ করে আপনার ক্রেডিট স্কোর ভালো রাখুন। এটি ভবিষ্যতে আরও ভালো শর্তে ঋণ পেতে সহায়ক হবে।
  • জরুরি অবস্থার জন্য সঞ্চয়: ঋণের উপর সম্পূর্ণ নির্ভর না করে, ছোট ছোট সঞ্চয় করে একটি জরুরি তহবিল তৈরি করার চেষ্টা করুন।

বিকাশ ডিজিটাল ঋণ সুবিধাভোগীদের জন্য একটি সুযোগ তৈরি করেছে তাদের ছোট ছোট আর্থিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য। কিন্তু এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করা এবং দায়িত্বশীলভাবে ঋণ গ্রহণ ও পরিশোধ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি কেবল আপনার ব্যক্তিগত আর্থিক স্বাস্থ্যই নয়, দেশের সার্বিক আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতাও নিশ্চিত করে।

কোম্পানির তথ্য
3.45/5
যাচাইকৃত বিশেষজ্ঞ
জেমস মিচেল

জেমস মিচেল

আন্তর্জাতিক অর্থ বিশেষজ্ঞ ও ক্রেডিট বিশ্লেষক

১৯৩টি দেশে লোন বাজার এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থা বিশ্লেষণে ৮ বছরের বেশি অভিজ্ঞতা। স্বাধীন গবেষণা এবং বিশেষজ্ঞ নির্দেশনার মাধ্যমে গ্রাহকদের সুবিবেচিত আর্থিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করি।

3 দিন আগে যাচাইকৃত
১৯৩টি দেশ
১২,০০০+ রিভিউ